অখিলবন্ধু মহাপাত্র।
একদিকে ঘন সবুজের অরণ্যের ধার ঘেঁষে বয়ে চলেছে স্রোতস্বীনি সুবর্ণরেখা। আর অন্যদিকে মন্দির বেষ্টিত প্রাসাদোপম সুদৃশ্য মহাশয় গড়ের রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ি। পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার প্রবেশদ্বারেই রয়েছে ঐতিহাসিক লক্ষ্মণনাথ এক সময় লক্ষ্মণনাথ ছিল এক ব্যক্তির নাম । পেশায় লেপ, কাঁথা, তোষক-বালিশ প্রস্তুতকারক যুগি বা যুগিয়া। এখন লক্ষ্মণনাথ ওড়িশার প্রবেশদ্বারে অবস্থিত ভ্রমন পিপাসু অজস্র মানুষের অন্যতম গন্তব্যের নাম। লক্ষ্মণনাথ এর অন্তরঙ্গ ও বহিরাঙ্গে রয়েছে বাংলা সংস্কৃতির স্পষ্ট ছাপ । সুদূর অতীতে এক বাঙালি জমিদারই গড়ে তুলেছিলেন লক্ষ্মণনাথকে । লক্ষ্মণাথের মহাশয় গড়ের দুর্গাপূজা বাংলা ও ওড়িশার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে ছিল অন্যতম আকর্ষণ। সুবিশাল দূর্গাপ্রতিমা, নহবতের সম্মোহিনী সুর, নবমীতে মহীষ বলি আর সুবর্ণরেখা নদীতে বিজয়া দশমীতে প্রতিমা নিরঞ্জন। এই সব কিছু একদিন দুই রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষকে আকর্ষণ করত। আজও দুর্গাপূজার দিন গুলিতে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে ঐতিহাসিক লক্ষ্মণনাথের মহাশয়গড় এর রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ির সামনে। আজও সুবিশাল দূর্গাপ্রতিমা হয়।
মহাশয়গড়ের মাঠে বিশাল মেলা বসে। অন্য দশ-বিশটা শব্দের তাণ্ডবে হারিয়ে গিয়েছে নহবৎ এর সুর। বন্ধ হয়ে গিয়েছে নবমীতে মহিষ বলিও। তবু ঐতিহ্যের টানে মানুষের ভিড়ে জন সমুদ্রে প্লাবিত হয় লক্ষ্মণনাথ। তবে দূর্গাপূজার সময় ছাড়াও অন্য সময়ে পর্যটকদের আগমন ঘটে ঐতিহাসিক লক্ষ্মণনাথের মহাশয়গড়ে।
প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণ চতুর্ভজের ৬০নম্বর জাতীয় সড়কের পশ্চিম মেদিনীপুর সীমান্ত অতিক্রম করে ওড়িশায় প্রবেশ করলে লক্ষ্মণনাথ রোড। রেল ও সড়ক পথে প্রথমে পৌছোতে হবে লক্ষ্মাণনাথ রোড। দক্ষিন পূর্ব রেলের খড়গপুর-ভদ্রক শাখায় লক্ষ্মণনাথ রোড স্টেশন । সেখান থেকে পশ্চিমে প্রায় ৫কিলোমিটার পথ অতিক্রম করলেই লক্ষ্মণনাথ গ্রাম। ডাইনে বাঁয়ে বাদামের ক্ষেত। আর গুটিকয়েক ইঁটের ভাটা। বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই যে গ্রামের অভ্যন্তরে রয়েছে সুবিশাল অট্টালিকা। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে অবস্থিত এই গ্রামের কেন্দ্রস্থলেই রয়েছে ১৭২০ সালে তৈরী ঐতিহাসিক মহাশয়গড় । জমিদার বাড়ি বা রাজবাড়িটি গড়ে উঠেছিল ২একর জমির উপর। লক্ষ্মণনাথে পৌঁছানোর আগে একবার ফিরে দেখা যাক অতীত ইতিহাসটা।
একসময় অজয় ও দামোদর নদীর তীরবর্তী এলাকায় রাজত্ব করতেন শূর বংশের রাজারা। গোপভূম নামে বাংলার ওই এলাকার রাজা ছিলেন আদিশূর। জানা যায় ৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা আদিশূর পুত্র্যোষ্ঠি যজ্ঞের জন্য কান্যকুব্জ বা কনৌজ থেকে ৫ ব্রাহ্মণ ও ৫ কায়স্থকে এনেছিলেন। সেই কায়স্থদের অন্যতম ছিলেন মকরন্দ ঘোষ। মকরন্দ ঘোষের ১৪পুরুষ পর রামচন্দ্র ঘোষ সম্রাট হোসেন শাহ্ এর আমলে ওড়িশার জলেশ্বর সদর কানুনগো এলাকার কর আদায়কারী জমিদার বা মহকুমা শাসক এর দায়িত্ব পান। ১৫০৮ সাল নাগাদ রামচন্দ্র ঘোষ জলেশ্বরে সদর কানুনগোর দায়িত্ব পান। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মভীরু এবং প্রজাবৎসল শাসক। সেই সময় থেকেই জলেশ্বরে রামচন্দ্র ঘোষ দূর্গাপূজার আয়োজন করেন। গড়েছিলেন বিশাল দুর্গামণ্ডপও। ধর্মচর্চা ও সমাজসেবার কাজে ব্যাস্ত থাকায় নবাব হোসেন শাহকে সময় মত কর দিতে পারতেন না । কথিত আছে রামচন্দ্র ঘোষ জলেশ্বরের সদর কানুনগোর দায়িত্ব পাওয়ার পর পুরী যাওয়ার পথে স্বয়ং শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু জলেশ্বরে অবস্থান করেন। জানা যায় রামচন্দ্র ঘোষ তার দূর্গামণ্ডপে মহাপ্রভুকে স্থান করে দিয়েছিলেন। সত্যদ্রষ্টা মহাপ্রভু জলেশ্বরে অবস্থান কালেই রাজা রামচন্দ্র ঘোষকে বলেছিলেন 'এই স্থান রামচন্দ্র ঘোষের মত প্রজাবৎসল মানুষের পক্ষে উপযুক্ত নয়।' রাজা রামচন্দ্র ঘোষ শ্রী চৈতন্য মহাগ্রভুকে জলেশ্বর থেকে চন্দনেশ্বর হয়ে জলপথে বঙ্গপোসাগরে পুরী বা নীলাচলে যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন।
রামচন্দ্র ঘোষ নবাবকে যথা সময়ে কর দিতে না পারায় একসময় বন্দী হন। তবে শুধু রামচন্দ্র ঘোষ নন। একই সঙ্গে নবাবের সেনাবাহিনী কয়েকজন প্রজাকেও কর্তব্য অবহেলার অজুহাতে বন্দী করেন। কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় রামচন্দ্র ঘোষকে কুলদেবী শ্যামাসুন্দরী স্বপ্নাদেশে নিজে বন্দী থেকে প্রজাদের মুক্ত করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে বলেন। স্বপ্নে কুলদেবীর নির্দেশ পেয়ে রাজা রামচন্দ্র ঘোষ অন্যদের মুক্ত করে নিজে বন্দী থাকেন। নবাবের কানে এই সংবাদ যাওয়ার পর হোসেন শাহ রামচন্দ্র ঘোষকে মুক্তি দেন এবং মহাশয় উপাধিতে ভূষিত করেন । এভাবেই রামচন্দ্র ঘোষ হয়ে যান রামচন্দ্র মহাশয়।
ওড়িশার প্রবেশদ্বার জলেশ্বরে এভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল রামচন্দ্র মহাশয় ও তাঁর উত্তরাধিকারীরা রামচন্দ্র মহাশয়ের কয়েক পুরুষ পর রাজত্ব করতেন লক্ষ্মীনারায়ণ মহাশয়। একসময় গোটা দেশ চলে যায় বৃটিশদের দখলে। বৃটিশরা মহাশয় রাজাদের 'রায় মহাশয়' উপাধিতে ভূষিত করে। লক্ষীনারায়ণ রায় মহাশয়ের রাজত্বের সময় ওড়িশার বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে হিন্দু ধর্মস্থান গুলিতে তাণ্ডব চালায় মহম্মদ তোকী। ওই সময় হিন্দু ধর্মস্থান গুলিতে ও চরম আঘাত আনে মহম্মদ তোকীর বাহিনী। দুর্মতি মহম্মদ তোকীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া ও নিরবিলিতে ধর্মাচরণের জন্য নতুন যোগ্যস্থান খুজতে শুরু করেন লক্ষ্মীনারায়ণ রায় মহাশয়। অবশেষে তিনি লক্ষ্মণনাথের সন্ধান পান। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে জঙ্গলে ঢাকা এই এলাকায় এসে তিনি দেখেন লক্ষ্মণ নাথ (নাম লক্ষ্মণ আর পদবী নাথ' ) নামে এক ব্যক্তি একটি শিবলিঙ্গের পুজা করছেন। লক্ষণ নাথ এর সহযোগিতায় লক্ষ্মীনারায়ণ রায় মহাশয় এ স্থানে নিজের আবাসস্থল তৈরী করেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল ধর্মাচরণ এবং অন্যদিকে প্রজাদের মঙ্গল কামনা।
১৭২০ সাল থেকেই লক্ষ্মণনাথে দুর্গাপূজার প্রচলন হয়। রাজা লক্ষ্মীনারায়ণ রায় মহাশয়ের দুর্গাপূজার লক্ষ্যও ছিল প্রজাকুলের দূর্গতিনাশ।
প্রায় ২একর জমি জুড়ে এক সময় ছিল বিশাল রাজবাড়ী। রাজবাড়ির অভ্যন্তরে অনেকটা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ীর দালানের মতো ৭টি উঠোন ছিল । দরজার সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫০টি । আর জানালার সংখ্যা ছিল ২০০এর বেশি। এখন মোট ৪টি উঠোন আছে। এখন ৪৮টি কক্ষ বা ঘর রয়েছে ১৫৮টি জানালা ও ১১০টি দরজা । লক্ষ্মণনাথের রাজবাড়ী ছাড়াও রয়েছে ১৩৮টি পরিবার। রাজবাড়ীর সামনে পূর্বদিকে রয়েছে একটি পুকুর। পুকুরের পশ্চিম পাড়ে ৮টি সারিবদ্ধ শিব মন্দির, অন্নপূর্ণা মন্দির আর এই মন্দির গুলির বিপরীতে রয়েছে জগন্নাথ দেবের মন্দির। রাজবাড়ির প্রবেশদ্বার থেকে কয়েক মিটার পশ্চিমে এগিয়ে গেলেই বিশাল দুর্গামণ্ডপ। রাজবাড়ির দুর্গামগণ্ডপ যেভাবে তৈরী হয় সেই আদলেই তৈরী হয় এখানকার স্থায়ী দক্ষিনমুখী দৃর্গামণ্ডপ। পরিবারের অন্দরমহলের মহিলাদের জন্য দেবীর সম্মুখভাগে রয়েছে ছোট্ট ব্যালকনি। সেখান থেকে রায় মহাশয় পরিবারের মহিলা সদস্যরা দেবীদশভূজার আরাধনায় অংশ নিতেন।
রাজবাড়ির অভ্যন্তরে রয়েছে কুলদেবী শ্যামাসুন্দরীর বিশাল মন্দির। রয়েছে রাস মঞ্চও। এছাড়া অতীতের গোশালা, অশ্বশালা এবং হাতিশালার অস্তিত্বও। পৃথিবীর বহু দুষ্প্রাপ্য বই সম্বলিত একটি গ্রন্থাগারও রয়েছে। দূর্গাপূজার সময় রাজবাড়ির একাংশ উন্মুক্ত থাকে সাধারণের জন্য । তাছাড়া অন্য সময় এখানে এলে অবশ্যই খোঁজ করে নেবেন লক্ষ্মণনাথের প্রবীন নাগরিক ক্ষেত্রমোহন সিন্হার । যিনি এই রাজবাড়ির ইতিহাস নিয়ে রীতিমত গবেষনা করেছেন।
স্বাধীন ভারতে আজ আর রাজা নেই। নেই জমিদারও। তবে লক্ষাণনাথের রাজবাড়ি আছে । আছেন লক্ষ্মীনারায়ণ রায় মহাশয়ের বর্তমান প্রজন্মের বংশধররাও। এখন অবশ্য রায় মহাশয় হয়ে গিয়েছে রায়। লক্ষ্মণনাথের মহাশয়গড়ের প্রতিষ্ঠাতা রাজা বা জমিদার লক্ষ্মীনারায়ণ রায় মহাশয়ের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে অন্যতম কলকাতার লেক টাউনের বাসিন্দা সৌরীন্দ্রনারায়ণ রায় এখনও তার পিতৃপুরুষের স্মৃতি বিজড়িত এই অট্টালিকাটিকে সংরক্ষণের চেষ্টা করে চলেছেন। ২০১৪ সালেই নতুন করে রঙ করা হয়েছে। মাঝে মধ্যেই এখানে অবস্থান করেন সস্ত্রীক সৌরীন্দ্রনারায়ণ বাবু৷ সদালাপী সৌরীন্দ্রনারায়ণ বাবুর সহধর্মিনী শুভ্রা রায়ও কলকাতার কোলাহল ছেড়ে অতীতের ঐতিহ্য বহন করা এই রাজবাড়িতে অবস্থান করেন। অষ্টালিকার অভ্যন্তরে বিচরণ করলেই দেখা যাবে অতীতের দেশ বিদেশের নানান আসবাব পশুর মাথা কিংবা ঝাড়বাতি। ওড়িশা রাজ্যের অন্তর্গত হলেও লক্ষ্মণনাথের এই রাজবাড়ির অস্তিত্বের সঙ্গে সংপৃক্ত হয়ে আছে বাংলা সংস্কৃতি।
শুধু রাজবাড়ি নয়। সেই সঙ্গে লক্ষ্মণনাথ গ্রাম জুড়ে রয়েছে আরও ৪টি শিব মন্দির, শীতলা মন্দির ইত্যাদি। রাজবাড়ির অনতি দূরে রয়েছে প্রায় ৫০একর জমিতে সেগুন গাছের ঘন জঙ্গল। সম্প্রতি সুবর্ণরেখা নদীর উপর নির্মিত হয়েছে একটি সেতু। কথিত আছে নদীর বালিতে সোনার কনা পাওয়া যেত বলে নাম হয়েছিল সুবর্ণরেখা। লক্ষ্মণনাথের পাশ দিয়েই বয়ে গিয়েছে সেই সুবর্ণরেখা নদী। তাই প্রান জুড়িয়ে দেওয়া ঘন সবুজ অরণ্য, ওড়িশ্যা রাজ্যের নিজস্ব সংস্কৃতি সাবলীল গতিতে বয়ে যাওয়া সুবর্ণরেখা নদী আর বাংলা সংস্কৃতির স্তম্ভ মহাশয়গড় লক্ষ্মণনাথকে করে তুলেছে অনন্য। যতবারই গিয়েছি লক্ষ্মাণনাথে ততবারই শুনেছি একই আহ্বান “আউথরে আসিব" - প্রত্যুত্তরে বলতে ইচ্ছে হয় “আউথরে নুহে - ফেরি ফেরি আসিবি"। আপনাকেও বারবার টানবে ওড়িশায় বাংলার লক্ষ্মণনাথ।
midnapore.in